বিদেশে উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশিদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তবে ডিগ্রি অর্জনের পর অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ বা ক্যারিয়ার গড়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ থাকাটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যাদের শিক্ষাজীবন শেষের পথে, তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ একটু বেশিই থাকে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এই উদ্বেগের অবসান ঘটাতে এবং পেশাগত জীবনে প্রবেশের পথ সুগম করতে অস্ট্রেলিয়া সরকার চালু রেখেছে ‘সাময়িক স্নাতক ভিসা’ (Temporary Graduate Visa), যা সাবক্লাস ৪৮৫ নামেও পরিচিত।
অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ তৈরি করতে এই ভিসাটি একটি সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে গ্র্যাজুয়েটরা তাদের অর্জিত ডিগ্রির সঙ্গে সম্পর্কিত বা যেকোনো পেশায় কাজ করে মূল্যবান অস্ট্রেলিয়ান কর্ম অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। পরবর্তীতে এই অভিজ্ঞতাই তাদের দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের (PR) পথ প্রশস্ত করে।
সাময়িক স্নাতক ভিসা কী?
সহজ কথায়, সাময়িক স্নাতক ভিসা হলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি অনুমতিপত্র, যা তাদের অস্ট্রেলিয়ান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশটিতে বসবাসের ও পূর্ণকালীন কাজের সুযোগ দেয়। এই ভিসার অধীনে শিক্ষার্থীরা তাদের অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ পান। মূলত দুটি প্রধান স্ট্রিমের মাধ্যমে এই ভিসা দেওয়া হয়:
১. পোস্ট-হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ক স্ট্রিম (Post-Higher Education Work Stream): যারা অস্ট্রিলিয়ায় ব্যাচেলর, মাস্টার্স বা পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন, তারা এই স্ট্রিমের আওতায় আবেদন করতে পারেন। ২. পোস্ট-ভোকেশনাল এডুকেশন ওয়ার্ক স্ট্রিম (Post-Vocational Education Work Stream): যারা ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (VET) বা কোনো ট্রেড কোর্স সম্পন্ন করেছেন, তাদের জন্য এই স্ট্রিমটি প্রযোজ্য।
ভিসার মেয়াদ ও থাকার সময়কাল
আবেদনকারী এই ভিসার অধীনে অস্ট্রেলিয়ায় কতদিন থাকতে পারবেন, তা নির্ভর করে তাদের যোগ্যতার স্তরের ওপর। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ভিসার মেয়াদ সাধারণত নিম্নরূপ:
-
স্নাতক ও কোর্স-ভিত্তিক মাস্টার্স: সাধারণত ২ বছর পর্যন্ত।
-
গবেষণা-ভিত্তিক মাস্টার্স বা ডক্টরেট (PhD): ৩ বছর পর্যন্ত মঞ্জুর করা হতে পারে।
-
VET স্ট্রিম: প্রাসঙ্গিক মানদণ্ড সাপেক্ষে সাধারণত ১৮ মাস পর্যন্ত।
আবেদনের যোগ্যতা ও শর্তাবলি
সাময়িক স্নাতক ভিসা পেতে হলে আবেদনকারীকে বেশ কিছু কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে বয়স এবং ইংরেজি দক্ষতা অন্যতম।
-
বয়সসীমা: আবেদনের সময় প্রার্থীর বয়স অবশ্যই ৩৫ বছরের নিচে হতে হবে।
-
সাম্প্রতিক গ্র্যাজুয়েট: কোর্স শেষ করার ৬ মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
-
স্টাডি রিকোয়ারমেন্ট: প্রার্থীকে অবশ্যই ‘ক্রিকোস’ (CRICOS) নিবন্ধিত কোর্সে অন্তত দুই একাডেমিক বছর পড়াশোনা সম্পন্ন করতে হবে। ক্রিকোস-বহির্ভূত কোর্স এই ভিসার জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
-
ইংরেজি দক্ষতা: আইএলটিএস (IELTS), টোয়েফেল (TOEFL) বা পিটিআই (PTE)-এর মতো স্বীকৃত পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত স্কোর থাকতে হবে।
-
স্বাস্থ্য ও চরিত্র: বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে।
আবেদন প্রক্রিয়া ও সতর্কতা
সাময়িক স্নাতক ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক। অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব হোম অ্যাফেয়ার্স পরিচালিত ‘ইমিঅ্যাকাউন্ট’ (ImmiAccount) পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। আবেদনের সময় প্রয়োজনীয় সকল ডকুমেন্ট সঠিক ও নির্ভুলভাবে আপলোড করা জরুরি। ভুল তথ্য বা অসম্পূর্ণ ডকুমেন্ট দিলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ভিসা পাওয়ার পর সুবিধা
এই ভিসাটি পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটরা অস্ট্রেলিয়ায় পূর্ণ কাজের অধিকার (Full Work Rights) পান। উচ্চশিক্ষা স্ট্রিমের আওতায় ভিসা প্রাপ্তরা যেকোনো খাতে, যেকোনো নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারেন এবং এর জন্য কোনো আলাদা স্পন্সরশিপের প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে, VET গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে সাধারণত তাদের পড়াশোনার ক্ষেত্র বা সংশ্লিষ্ট পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তাদের জন্য এই ভিসাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। তাই পড়াশোনা চলাকালীন সময়েই এই ভিসার প্রস্তুতি নেওয়া এবং সঠিক নিয়ম মেনে আবেদন করা উচিত।